অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ মডেলকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের প্রসার না ঘটলে রাজস্ব আহরণও বাড়বে না। রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে গতকাল ‘প্রাক-বাজেট আলোচনা ২০২৫-২৬: বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা’ শীর্ষক প্রাক-বাজেট আলোচনায় এমন অভিমত দেন বক্তারা। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি তাসকিন আহমেদ। এ সময় দেশের বিভিন্ন খাতের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সরকারকে বিনিয়োগভিত্তিক মডেলেই এগোতে হবে। বিনিয়োগ ও বাণিজ্য যদি না বাড়ে, তবে রাজস্ব আহরণও বাড়বে না। জিডিপির তুলনায় কর আহরণের যে ব্যবধান, সেটি কখনই ঘুচবে না। অতীতে রাষ্ট্র পরিচালনায় টাকা ছাপিয়ে সংকট কাটানোর ব্যর্থ চেষ্টা হয়েছে, যা সংকটকে আরো ঘনীভূত করেছে। এখন আমাদের যেতে হবে বিনিয়োগমুখী পথে। বিনিয়োগ ছাড়া ট্যাক্স বা জিডিপির কথা বলে লাভ নেই।’ তাই দেশী-বিদেশী উভয় ধরনের বিনিয়োগে গুরুত্ব দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বাংলাদেশের রফতানির ওপর শুল্কারোপ প্রসঙ্গে ইন্টারন্যাশন্যাল চেম্বার অব কমার্স-বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সরকারের উচিত এ ব্যাপারে আলোচনার উদ্যোগ নেয়া। পাশাপাশি ডিসিসিআইসহ বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা।’
তিনি বলেন, ‘শুধু কর ব্যবস্থাপনাই নয়, শুল্ক কাঠামোকে সম্পূর্ণ অটোমেশনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। বাজেট শুধু এক বছরের জন্য নয়, দেশী বিনিয়োগকারীদের আগামী বাজেটে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সুবিধা দেয়া হলে দেশের অর্থনীতিতে তারা অধিক হারে অবদান রাখতে পারবেন।’
এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘পুরো রাজস্ব ব্যবস্থাপনার অটোমেশনের পাশাপাশি বিদ্যমান রাজস্ব, ভ্যাট ও শুল্ক হার যৌক্তিকীকরণ করা হবে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর সম্প্রতি ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো চালু করা হয়েছে এবং ব্যবসায়ীরা এর সুবিধাও পাচ্ছেন। কর কাঠামোর প্রতিটি স্তরে সামনের দিনগুলোয় অটোমেশন বাস্তবায়ন করা হবে।’ এছাড়া শিগগিরই বন্ড অটোমেশন প্রকল্প চালু করা হবে বলেও জানান তিনি।
এনবিআর চেয়ারম্যান সভায় আরো জানান, দেশে এমনিতেই ব্যক্তি পর্যায়ে এবং করপোরেট কর হার তুলনামূলক কম, তাই এ বছর ওই খাতে কর অপরিবর্তিত রাখার ইঙ্গিত দেন তিনি। তবে আগামী বাজেটে রাজস্ব হারে বিদ্যমান বৈষম্য দূর হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন এনবিআর চেয়ারম্যান।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘আমরা এমন একটি বাজেট চাই যা ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়াবে। আমাদের পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করার পাশাপাশি রফতানি বৃদ্ধির সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য আগামী বাজেটে নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ব্যবসায়ীদের জন্য এক রকম নীতি, আর সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য আরেক রকম নীতি দেখা যায়—এটা কোনো নিয়ম হতে পারে না। উভয়ের জন্য একই রকম রাজস্ব ও মূল্যনীতি থাকা উচিত, যাতে নীতিগত সামঞ্জস্য থাকে।’
ব্যবসায়ী নেতা মীর নাছির হোসেন বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি আরো কঠোর করা হচ্ছে, যা ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা হওয়া উচিত। কৃচ্ছ্রসাধন শুধু বেসরকারি খাতে নয়, সরকারি খাতেও প্রয়োজন।’